লেখিকা: সাবেক ডেপুটি ডিরেক্টর, বাংলা একাডেমী। বর্তমানে মালদ্বীপে বসবাস করেন।

বর্তমান প্রজন্ম: আমাদের ভাবনা

Print Friendly, PDF & Email

[ A+ ] /[ A- ]

জান্নাতুন আরা আহমেদ

সঞ্চয়পত্রের টাকা তুলতে আমি নিয়মিত ডাকঘরে যাই। একই উদ্দেশ্যে আমার মতো আরও অনেকেই সেখানে আসেন। একটি মাত্র কাউন্টার থেকে টাকা দেয়া হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে এক এক করে টাকা তুলতে হয়। তাই বেশ কিছুক্ষণ সেখানে থাকতে হয়। ফলে অনেকের সঙ্গেই নানা বিষয়ে আলাপ আলোচনা হয়। এই আলাপচারিতায় নানা প্রসঙ্গের মাঝে ছেলেমেয়েদের কথা এসেই পড়ে। বিশেষ করে ছেলেমেয়েদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া আনা, কোচিং এ নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনেকেই বললেন, ছেলেমেয়েরা তাদের কথা শোনেনা, নিষেধ মানে না, কোন কিছু করতে বললে করতে চায় না। তবে পড়ার চাপ খুব বেশী।

তাদের এমনি আরো কথা শুনি আর ভাবি। কিছু উন্নত দেশে আমার যাবার সুযোগ হয়েছে। সেখানে ছিলামও অনেকদিন। সেখানে নীচের ক্লাসের ছেলেমেয়েদের পিঠে কোন ব্যাগের বোঝা থাকে না। বাড়িতে তাদের কোন পড়া থাকেনা। স্কুলেই পড়া শেষ হয়ে যায়। তাদের বই খাতা স্কুলেই থাকে। বাচ্চারা যত উপরের ক্লাসে উঠে, পড়ার চাপ তত বাড়তে থাকে। সামার ভেকেশনে আমাদের দেশের মত এক গাদা হোম ওর্য়াক থাকে না। ছুটি মানে ছুটি। বাবা মার সাথে তখন বেড়াতে যায়। স্কুল থেকে ক্যাম্পিং এ যায়। কয়েক সপ্তাহ থেকে মাস অবধি। সেখানে তারা তাঁবু খাটিয়ে থাকে। নিজেদের সব কাজ নিজেদের করতে হয়। নিজের কাজ নিজে করা ছাড়াও বাস্তব জীবনে চলার উপযোগী আরও অনেক কিছু শেখে যা পাঠ্যপুস্তকে থাকেনা। বিপদে পড়লে কিভাবে নিজেকে কিংবা অন্যকে রক্ষা করা যায়, তাও তারা ক্যাম্পিং এ শেখে।

ছুটির সময়ে তাদের কিছু প্রজেক্ট দেয়া হয়। যেমন, বাগানের মডেল, নিজের দেশ সম্পর্কে ২০ লাইন লেখা, বেড়ানোর গল্প লেখা ইত্যাদি। উপরের ক্লাসের ছেলেমেয়েদের স্কুল লাইব্রেরীতে কাজ করা, অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীদের সাহায্য করা। আরও নানা রকমের প্রজেক্ট দেয়া হয়। যেমন, দশ লাখ ডলার সাত দিনের মধ্যে খরচের একটা প্রজেক্ট কিংবা কোর্টে একটা কেস সাজানো হয়। সেখানে দুপক্ষেই উকিল থাকে। বলাবাহুল্য, কোর্টে কেস পেশ করা, দু’পক্ষের উকিল জেরা করা – সবটাই একটা সাজানো প্রজেক্ট এবং এই প্রজেক্টগুলো সবই একাডেমিক, লেখাপড়ার অঙ্গ। এককথায় শুধু পাঠ্যপুস্তকের উপর নির্ভর না করে তাদের পুঁথিগত বিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। আজকাল ছেলেমেয়েদের গল্পের বই পড়তে খুব একটা দেখা যায়না। এর ফলে মনের সুকোমল বৃত্তিগুলো বিকশিত হতে পারেনা। এতে জীবনের পূর্ণ বিকাশ ঘটেনা। এর ফলে তাদের অতি অল্পতেই রেগে যাওয়া, অন্যের প্রতি হিংস্র হয়ে উঠা, এমন কি কখনো কখনো খুন খারাবির মত ঘটনাও ঘটিয়ে ফেলতে দেখা যায়। অনেক মায়েরা বলেন, গল্পের বই পড়ার সময় কোথায়? সকালে স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে এসে কোচিং এ যাওয়া, কোচিং থেকে এসে পড়তে বসা। খেলাধুলো, গল্পের বই পড়ার সময় কোথায়?

এখন সমাজে একটা অস্থিরতা চলছে। বাবারা অর্থ ও প্রতিপত্তির পিছনে এত ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানের প্রতি ঠিকমতো সময় দিতে পারেননা। মায়েরাও অনেকে চাকুরীজীবী। সুতরাং চাকরি, সংসারের ঝামেলা – সবকিছু সামলিয়ে সন্তানের প্রতি প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছেন না। ফলে কোচিং এ দিয়ে ভাবছেন যথার্থ দায়িত্ব পালন করা হলো। কিন্তু অভিভাবকগণ কি কখনো ভেবেছেন যে তাদের সন্তানেরা কোচিং এ কি শিখছে? কোচিং এ তারা শিখছে – কিভাবে পড়লে জি.পি.এ-৫ পাওয়া যায়। শিক্ষকরাও তাদের এভাবেই তৈরি করছেন। ফলে তারা শিখছে কম, শুধু তোতাপাখির মতো মুখস্থ করছে। অধিকাংশ কোচিং সেন্টারের শিক্ষকদের একমাত্র প্রচেষ্টা থাকে, কিভাবে ছাত্র/ছাত্রীরা জি.পি.এ-৫ পাবে। কেননা যে সব কোচিং সেন্টারে রেজাল্ট বেশী ভালো হবে, পরবর্তীতে সেই সব সেন্টারে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসবে। আজকাল অধিকাংশ শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে থাকে অর্থ রোজগার করা, জ্ঞান বিতরণ করা নয়। ছেলেমেয়েদের মানসিক ও চারিত্রিক গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। এ জন্যে তাদের বলা হয়-মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, শিক্ষকরা তাদের এই মহান দায়িত্ব যথাযথ পালন করেন কি?

যুগের বদল হয়েছে। এই বদলে ভালো-মন্দ দূটোই এসেছে। আবার কিছু ভালো চলেও গিয়েছে। বিশেষ করে আজ মূল্যবোধের যে অবক্ষয় হয়েছে, তাতে বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে চিন্তা হয়। আর একটা কথা। আর তা হচ্ছে, অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ রইলো, তারা যেন ছেলেমেয়েরা কিছু চাইলেই তা সঙ্গে সঙ্গে না দেন। প্রথমত, যদি দেয়ার ক্ষমতা না থাকে তাহলে রাগ বা বকাবকি না করে সুন্দর করে বোঝাবেন। আর যদি দেয়ার ক্ষমতা থাকে, তাহলে দেয়ার আগে ভাবতে হবে যে, সে যা চেয়েছে, তা সে পাওয়ার যোগ্য কিনা কিংবা আদৌ সেটি তার প্রয়োজন কিনা। অপব্যয় যে ভালো নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই যে সংযমী হওয়ার প্রয়োজন আছে, সেটা খুব ছোটবেলা থেকেই তাদের বোঝানো প্রয়োজন। আর হ্যাঁ, অযথা তাদের হাতে অর্থ দেয়া ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে অনেক সময়ে অর্থই অনর্থের মূল হয়ে পড়ে উদাহরণ স্বরূপ হালের আলোচিত চরিত্র ঐশীর কথা বলা যায়। বর্তমানে ইন্টারনেট ও মোবাইল আর এক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এর ভালো/মন্দ-দুটো দিকই আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ছেলেমেয়েরা এর মন্দ দিকটা অর্থাৎ সব সময় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। এর ফলে তারা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে। ভাইবোনদের সাথেও কথা বলছে কম, লোকের সঙ্গে মিশছে কম, আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে এবং নিজেদের একটা আলাদা জগৎ তৈরি করে নিচ্ছে।

অভিভাবকরাও এসব কাজে অনেকটাই জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে তারা ছেলেমেয়েদের কার্যকলাপ ঠিকমতো লক্ষ্য করছেননা। কিন্ত অভিভাবকদের উচিৎ তাদের প্রতি লক্ষ্য রাখা। তারা ঠিকমতো লেখাপড়া করছে কিনা, কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মিশছে, কিভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, বিশেষ করে স্মার্টফোন। এ থেকে পরিত্রাণ পেতেই হবে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অভিভাবকদের উচিৎ ছেলেমেয়েদের বেশী করে সঙ্গ দেয়া, তাদের সঙ্গে গল্প করা, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, সমাজ, দেশ নিয়ে আলোচনা করা ও সেই সঙ্গে উচিৎ/অনুচিৎ বিষয়ে জ্ঞান দেয়া এবং সর্বোপরি পারিবারিক বন্ধনের প্রতি আকৃস্ট করা।

আসুন না আমরা অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজ সচেতন ব্যক্তি এবং সরকার-সবার প্রচেষ্টার মাধ্যমে সন্তানদের যথার্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি যাতে তারা এই সুজলা, সুফলা বাংলাদেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে একটি বসবাসযোগ্য সুন্দর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। আসুন পরিবার থেকেই শুরু করা যাক। ছেলেমেয়েদের প্রতি আরো যতœবান হই, মনোযোগ দেই, সঙ্গ দেই। তবেই ওরা মানুষের মতো মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারবে।

আমি এই মুহূর্তে মালদ্বীপে আছি। স্কুলগুলোতে লক্ষ্য করেছি লেখাপড়ার চাপ কম। স্কুল কতৃপক্ষ ও অভিভাবকগণ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার বাইরে নানারকম সামাজিক কাজে যুক্ত করে। যেমন, যেখানে সেখানে পড়ে থাকা পাত্রগুলো সরিয়ে ফেলা ইত্যাদি। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পার্কে নিয়ে যায়, সাইকেলে শহর ঘোরায়, সমুদ্রে সাতার শিখায় এবং বিভিন্ন কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত করানোর জন্য তাদেরকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। মাত্র অল্পদিন হলো এরা সভ্যতার দিকে এগুচ্ছে, কিন্তু এতো অল্প সময়েরর মধ্যেই তাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের উপযুক্ত মানুষ তৈরি করার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এদের কাছ থেকেই আমাদের শিখতে হবে।

লেখিকা: সাবেক ডেপুটি ডিরেক্টর, বাংলা একাডেমী। বর্তমানে মালদ্বীপে বসবাস করেন।