শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত ভাষাসৈনিক হালিমা খাতুন

Print Friendly, PDF & Email

[ A+ ] /[ A- ]

নিউজ ডেস্ক : ছেষট্টি বছর আগে যে আমতলায় বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন, সেখানেই প্রিয়জনের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হলেন চির বিদায় নেওয়া ভাষা সংগ্রামী হালিমা খাতুন।

বুধবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলী পর্বে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা তার প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।

দীর্ঘ দিন রোগ ভোগের পর রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার দুপুরে মারা যান ৮৬ বছর বয়সী এই ভাষা সৈনিক।

রাতে ধানমণ্ডি নাতনীর বাসভবনে ফ্রিজিং ভ্যানে রাখা হয় হালিমা খাতুনের মরদেহ। বুধবার সকাল সোয়া ১১টার দিকে তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

সেখানে শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জেএসডি (নাজমুল হক প্রধান), সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘর, ভাষা আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদ, উদীচী, খেলাঘর, ছায়ানট, পেশাজীবী নারী সমাজ, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ আরো অনেক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

এ পর্বে হালিমা খাতুনের একমাত্র সন্তান আবৃত্তিশিল্পী প্রজ্ঞা লাবণী বলেন, “ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির পথ ধরে থেকে যাবেন হালিমা খাতুন। তার নাম উচ্চারিত হবে পরবর্তী প্রজন্মের কণ্ঠে।”
প্রজ্ঞা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত শিশুতোষ বইগুলো দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিলিয়ে গেছেন শিশু সাহিত্যিক হালিমা খাতুন।

কিন্তু তার একটি বইও শিশুদের পাঠ্যক্রমে যুক্ত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন প্রজ্ঞা। পরে সরকারের কাছে দাবি জানান, তার মায়ের লেখনী যেন শিশুদের পাঠ্য তালিকায় সংযুক্ত করা হয়।

এই পর্বে ব্যক্তিপর্যায়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন হালিমা খাতুনের সহযোদ্ধা ভাষা সংগ্রামী রওশন আরা বাচ্চু।

তিনি বলেন, “বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারিতে সবাই আমাদের বলেছিল, ‘তোমার আজ লড়াই করো না। জীবনমরণের প্রশ্ন।’ কিন্তু আমরা সেদিন কথা শুনিনি কারো। আমরা ১৪৪ ধারার ব্যারিকেড ভাঙ্গব। হালিমা রইল আমাদের সঙ্গে একেবারে মিছিলের সামনে। আমরা যদি সেদিন ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গতাম, যদি সেই আত্মত্যাগ না করতাম.. তবে আজকে বাংলা ভাষা কোথায় থাকত!

হালিমা চলে গেল। কিন্তু ওর স্মৃতিগুলো তো রক্ষা করা যায় নানাভাবে। আমরা থাকব না একদিন। আমাদের কথা জানাতে হবে পরের প্রজন্মকে।

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জানান, হালিমা খাতুনের সঙ্গে তার ৬৫ বছরের সম্পর্কে যতিচিহ্ন পড়ল মঙ্গলবার।

“আমি হালিমা খাতুনকে আমার বড় বোনের মতো জানতাম। তিনি আমাকে অনুজের মতো স্নেহ করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আমার সিনিয়র ছিলেন। কিন্তু আমরা একইসঙ্গে সাংস্কৃতিক আন্দোলন করেছি। দীর্ঘকালের এই সম্পর্ক আজ শেষ হল,”বলতে বলতে আবেগ্লাপুত হয়ে পড়েন প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর অভিযোগ, দীর্ঘকাল অসুস্থ থাকার পরও সরকার বা সামাজিক কোনো সংগঠন হালিমা খাতুনের শারীরিক অবস্থার ‘কোনো খোঁজ করেননি’।

পরে তিনি বলেন, “দুঃসাহসী এই মহিলা একাধারে একজন সাহিত্যিক, রাজনীতি ও সমাজ সচেতন মানুষ ছিলেন। প্রগতিশীল ধারায় বিশ্বাস করতেন। তার মতো মানুষের খোঁজ না নেওয়া রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। তার মৃত্যুতে আজ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি ধারা নির্বাসিত হয়ে গেল।”

ভাষা সংগ্রাম ও পরে সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য হালিমা খাতুনকে একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক প্রদান না করায় হতাশা প্রকাশ করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দীন ইউসুফ।

তার মতো নিভৃতচারী মানুষরা কখনো পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে চান না। তার নিভৃতে মানুষের জন্য কাজ করতে ভালোবাসেন। তিনি দেশের উদ্দেশ্যে যা বলতে চেয়েছিলেন, তা তার লেখনীর মাধ্যমে জাতিকে বলে গেছেন।

প্রাবন্ধিক মফিদুল হক বলেন, “হালিমা খাতুন আজীবন মুক্তির সাধনা করে গেছেন। তিনি মননের উত্তরণে যে আদর্শ রেখে গেছেন, তার বিনাশ হবে না কখনও। চির উজ্জ্বল এই আদর্শ আমাদের পথ দেখাবে আগামীতে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান।

শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে হালিমা খাতুনের মরদেহ নিয়ে আসা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে জানাজার পর তাকে দাফন করা হবে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।