হে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, তোমার মৃত্যুর দায় আমাদেরও

Print Friendly, PDF & Email

[ A+ ] /[ A- ]

অধ্যক্ষ আসাদুল হক : তা, তোমার মৃত্যুর দায় আমাদেরও। তোমাকে রক্ষা করার মতো উপযুক্ত সন্তান আমরা হতে পারিনি। হয়তো এই অপরাধের গ্লানি বহন করতে হবে জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটি পর্যন্ত। তোমার দীর্ঘ সংগ্রাম আর আত্মত্যাগই আমাদের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড আর একটি লাল-সবুজের পতাকা দিয়েছে। অথচ সেই স্বাধীন দেশে একাত্তরের পরাজিত শক্তির সুগভীর চক্রান্তের শিকার হতে হলো তোমাকে। আমরা তা রোধ করতে পারিনি।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতার নামে আমরা আরেকটি পরাধীনতার কবলে পড়লাম। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে প্রত্যাখ্যান করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়া হলো আমাদের ওপর। আর তার প্রতিবাদ করায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ রক্তাক্ত হলো বাঙালির বুকের তাজা রক্তে। শোষণ-নিপীড়নের এক নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করে পাকিস্তানের শাসকরা। বাঙালি জাতি তাদের সব বৈষম্য আর শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। জন্ম হয় আওয়ামী লীগের। ক্রমে আওয়ামী লীগের ছয় দফা হয়ে ওঠে বাঙালির মুক্তির সনদ। জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন, এমনকি ফাঁসির দড়ির সামনে দাঁড়িয়েও যে মানুষটি বাঙালির মুক্তির লক্ষ্য থেকে এক পা সরে আসেননি, সামান্য বিচলিত হননি, তাঁর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবই সেই মানুষ, যিনি সহস্র বর্ষব্যাপী বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুপ্ত থাকা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সার্থক রূপ দিতে সমর্থ হন। উপমহাদেশে এমন মানবিক রাজনৈতিক চরিত্র বিরল। একসময় পাকিস্তানি শাসককুল দুর্বার গণআন্দোলনের চাপে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালের সেই নির্বাচনে শেখ মুজিব ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। তারপর ঘটতে থাকে পাকিস্তানি শাসককুলের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের নির্মম খেলা। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে তথা বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হলো না পাকিস্তানি শাসকরা। তার পরিবর্তে সামরিক বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি শুরু করে। এমনই চক্রান্তের মধ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’, যা একটি জাতিকে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যায়। বাঁশের লাঠি নিয়ে কামানের সামনেও বুক পেতে দিতে দ্বিধা করেনি সেদিন বাঙালি জাতি। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ও ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ, তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয় আরেকটি স্বাধীন জনগোষ্ঠী, যার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সংগত কারণেই তিনি বাঙালি জাতির জনক।

স্বাধীনতা প্রাপ্তির তিন বছরের মাথায় এই মহান মানুষটিকে হত্যা করে কিছু বিভ্রান্ত সৈনিক আর স্বার্থান্বেষী কিছু রাজনীতিবিদ। আর তার পেছনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান জিয়াউর রহমান। আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী চক্রও হাত মেলায় তাদের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতে পারেননি, কোনো বাঙালি তাঁর ক্ষতি করতে পারে। বিশ্বের কীর্তিমান নেতারা তাঁকে সাবধানী সংকেত দিলেও তিনি তা মানতে চাইতেন না। আগেই বলা হয়েছে, হাজার বছরের এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে শেখ মুজিবই মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন।

ঘাতকরা বাঙালি জাতির সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকেই শুধু হত্যা করেনি, শিশু রাসেলও নিস্তার পায়নি তাদের নৃশংসতা থেকে। সিঁড়িতে গড়াতে গড়াতে রক্তাক্ত বঙ্গবন্ধু নিজের জন্ম দেওয়া ভূখণ্ডেই শেষ আশ্রয় নিলেন, যা তাঁর কাছে ছিল পরম আরাধ্য। টুঙ্গিপাড়ার খোকা আজ টুঙ্গিপাড়াতেই শুয়ে আছেন।

জেনারেল জিয়া ও তাঁর সহযোগীরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার রহিত করার জন্য ‘ইনডেমনিটি’ বিল পাস করে রাখেন। খুনিদের পুরস্কৃত করেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ফিরে এলে ‘ইনডেমনিটি’ বিল জাতীয় সংসদে বাতিল করে জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসেন। সম্পূর্ণ আইনিপ্রক্রিয়া মেনে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। এই ঐতিহাসিক রায়ের মধ্য দিয়ে বাঙালিরা জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের কলঙ্ক তিলক মোচনে সক্ষম হয়। এরপর জাতি ধীরে ধীরে জেলহত্যাসহ অন্যান্য হত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

হে পিতা, আমরা সেই জাতি, যে জাতির জন্য তুমি তোমার জীবন উৎসর্গ করে গেলে। যে মানুষের জন্য তোমার অপরিসীম মমতা বিলিয়ে দিয়েছিলে, তারা তোমাকে ভুলে যায়নি। বরং মনে রাখবে চিরদিন। কবি বলেছেন, ‘কেবল তোমার জীবন তুচ্ছ পিতা?’ না? কতিপয় ঘাতক, পাকিস্তানি দোসর ছাড়া তোমাকে সবাই ভালোবাসে। ভালোবাসে বাংলার আকাশ-বাতাস, মজুর-মেহনতি মানুষ, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা পারের খেটে খাওয়া মানুষ। তারা অকৃতজ্ঞ নয়। তারা তোমার কাছে অশেষ ঋণী, যা কখনো ভুলে যাওয়ার উপায় নেই।

‘পিতা, আমি প্রথমেই বলেছি, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে রেখেছে। দীর্ঘ সময় তোমার বিদেহী আত্মা আমাদের আত্মার মর্মমূলে অব্যক্ত ক্রন্দন নিয়ে গুমরে উঠেছে। একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা বারবার তোমাকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে তোমার দেশপ্রেম করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। ঘাতকদের গাড়িতে উড়েছে তোমার প্রাণের পতাকা। কিন্তু ওরা ভুলে যায়, সত্য চিরকাল সুন্দরের পক্ষে। মানুষের আবেগসঞ্জাত ভালোবাসার মৃত্যু হতে পারে না। আর ইতিহাস চিরকাল সঠিক কথাই বলে। সেই ধারাবাহিকতায় ঘাতকদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া তোমার দুঃখী কন্যা শেখ হাসিনা নিহত জনকের রক্তাক্ত পথ ধরে বাংলার মানুষের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পিতার মতো তেজোদীপ্ত সাহস নিয়ে বাংলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে মানুষের উত্তাল ভালোবাসার কাছে নিজেকে অনিবার্য করে তোলেন। তিনবার তোমার বাংলার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা নিয়ে তাঁর প্রাণান্ত চেষ্টার বিরাম নেই। তিনি একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দেওয়া বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে, যার স্বপ্ন তুমি দেখেছিলে। তুমি খুশি হও পিতা। আমরাও তোমার মতো স্বপ্নভুক মানুষ। স্বপ্ন নিয়েই আগামীর পথে এগিয়ে যেতে চাই। মানুষের আত্মাকে কষ্ট দিয়ে নয়, ভালোবেসে।’

পিতা, তোমাকে হত্যা করে ঘাতকরা যে কুটিল জাল বুনেছিল, আমরা তা ছিন্ন করে তোমার কাঙ্ক্ষিত মর্যাদায় এগিয়ে যাচ্ছি। তুমি কি আমাদের ক্ষমা করবে না? কবি বলেছেন, ‘তোমার সৃষ্টির চেয়ে তুমি যে মহান।’ এর পরও যখন প্রশ্ন করি, তখন নিজেদের পরাজিত মনে হয়। গ্রিক ট্র্যাজেডির মতোই তোমার জীবন। মৃত্যুর পর তোমাকে নিয়ে কত গল্প, কবিতা, উপাখ্যান রচিত হচ্ছে। যত দিন বাঙালি জাতি থাকবে, তত দিন তোমার কীর্তি চির অম্লান হয়ে থাকবে। এর পরও আমি বিশ্বাস করি, দীর্ঘ ৪৪ বছর পর তোমাকে নিয়ে যারা অহেতুক কুৎসা রটায়, তারা ইতিহাসের ঘৃণিত আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। মহাকালের চিরসত্য নিয়মের বাইরে আমরা কেউ নই। ইতিহাসে তুমি থাকবে চির উজ্জ্বল হয়ে। ‘যতকাল রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

Leave a Reply