উন্নত দেশেও মূল্যস্ফীতি, সুবিধাজনক অবস্থায় বাংলাদেশ

Print Friendly, PDF & Email

অর্থনৈতিক রিপোর্টার : করোনার প্রকোপ ভুগিয়েছে সারা বিশ্বকে। সেই প্রভাব কাটতে না কাটতেই শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ যে শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে হচ্ছে তাই নয়, এই যুদ্ধের প্রভাব গিয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সারা বিশ্বের অর্থনীতির অবস্থাই এখন টালমাটাল। নিষেধাজ্ঞা-পাল্টা নিষেধাজ্ঞায় অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, এখন শুধু বিশ্বের দরিদ্র দেশ নয়, সেই প্রভাব গিয়ে পড়েছে উন্নত বিশ্বের ওপরও। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের মূল্যস্ফীতির দিকে তাকালেই সংকটের তীব্রতা টের পাওয়া যাবে। করোনা মহামারীর প্রকোপ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বিশ্ব এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে, সেখান থেকে সহসাই মুক্তি যে মিলবে সে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব সারা বিশ্বেই যেমন পড়েছে, তেমনি বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু অসাধু মানুষ নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এই মূল্যস্ফীতিকে অন্য রূপ দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা দেখাতে চাইছেন শুধুমাত্র বাংলাদেশেই মূল্যস্ফীতি হয়েছে। আর এসব বলে তারা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করারও চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রকৃত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থাই তুলনামূলক সহনীয় পর্যায়ে আছে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, গত জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও একদফা সুদের হার বাড়িয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এমন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার ঝুঁকি দেখছেন বিশ্লেষকরা। সেটি ঠেকাতে প্রতি মাসেই মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কয়েক বিলিয়ন ডলার করে বন্ড কিনছে; যা মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী করলেও, অস্থিতিশীল হচ্ছে বিশ্ব মুদ্রাবাজার। এ দৌড়ে যুক্তরাজ্যও খুব পিছিয়ে নেই। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়তে থাকার প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যে। রয়টার্সের জরিপ বলছে, যুক্তরাজ্যে জুন শেষে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। যা আগের মাস থেকে ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। ‘জুনে মাসিক ভোক্তা মূল্য ০ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে, যা আগের মাসের ০ দশমিক ৭ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছে। এপ্রিল থেকে এটি ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম।’ যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস (ওএনএস) বলছে, ১৯৮২ সালের পর সিপিআই সবচেয়ে বেশি হতে পারে চলতি বছর। আগামী জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে। জার্মানিতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে যাচ্ছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে খাবারের দাম আরও বাড়তে পারে। গত জুনে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

এদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়েছে তুরস্ক। এ সমস্যার জন্য দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের অর্থনৈতিক নীতিকে দায়ী করছেন সমালোচকেরা। কিন্তু এরদোয়ান বলছেন, উচ্চ সুদে ধার নেওয়ার কারণেই মূলত খরচ বেড়েছে। তুর্কি পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের (টিএসআই) তথ্য অনুযায়ী বার্ষিক মূল্যস্ফীতিতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পরিবহন খাতে। এ খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০৭ দশমিক ৬ শতাংশে উঠেছে। সব মিলিয়ে দেশটিতে গত জুনে মূল্যস্ফীতি গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশে। এছাড়াও রাশিয়ার মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ রাশিয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ফলে তাদের মূল্যস্ফীতি বাড়ছে বলে জানানো হয়েছে। গত জুনে রাশিয়ায় মূল্যস্ফীতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশে।

অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসও পড়েছে মূল্যস্ফীতির কবলে। দেশটিতে গত জুনে মূল্যস্ফীতি এসে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে। নেদারল্যান্ডসের বহুজাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আইএনজি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আইএনজি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বার্ট কোলিন বলেছে, ‘চলতি জুলাইয়ে আরও একটি কুৎসিত মূল্যস্ফীতি দেখতে হলো আমাদের।’ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি স্পেনে। দেশটিতে বিগত ৩৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। স্পেনের ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, দেশটিতে বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার ১০ দশমিক ৮ শতাংশ, যা মাত্র এক মাস আগেও ১০ দশমিক ২ শতাংশে ছিল।

মূল্যস্ফীতি ভারে জর্জরিত শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান। গত জুনে দেশ দুটিতে মূল্যস্ফীতির হার যথাক্রমে ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২১ দশমিক ৩২ শতাংশ। ন্যাশনাল কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স বা এনসিপিআই-এর নতুন হিসেবে মূল্যস্ফীতির এই ভয়াবহ অবস্থা উঠে আসে। এমনিতেই বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্য এবং জ্বালানির দাম বেশি। তারমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শেষ হওয়ার কারণে শ্রীলঙ্কায় বিদেশি পণ্য আমদানি প্রায় বন্ধ রয়েছে। আর এ কারণেই দেশের মধ্যে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দিন যত যাচ্ছে এই সংকট আরও গভীর হচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থাও দিনের পর দিন শ্রীলঙ্কার দিকেই এগুচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, করোনা মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব সারা বিশ্বেই কম-বেশি পড়েছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। তবে অন্যান্য অনেক উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো অবস্থায় রয়েছে। দেশে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বৈশ্বিক এই সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায়ও সেসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বের সব দেশের মূল্যস্ফীতি বাড়ছে; এটি নিয়ে সব দেশের সরকার উদ্বিগ্ন। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বলছে, বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান সমস্যা এখন মূল্যস্ফীতি। এরকম পরিস্থিতিতেও দেশে কিছু অসাধু মানুষ এটিকে শুধুমাত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। কিন্তু প্রকৃত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থা ভিন্ন। বাংলাদেশ সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার এক সফলতার গল্প। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে আমরা। বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুঁড়ি বলার সাহস রাখে না কেউ। দেশের তারুণ্যের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। এ অবস্থায় দেশে মানুষের উচিৎ বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে সঠিক তথ্য জানা। তাহলেই বোঝা যাবে বাংলাদেশ এখনও সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।