হস্তান্তরিত ঋণের বড় অংশই খেলাপি

Print Friendly, PDF & Email

নিউজ ডেস্ক : এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের গ্রাহকের ঋণ ক্রয় বা টেকওভার (ঋণ হস্তান্তর) হচ্ছে। ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত চার হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ঋণ হস্তান্তরের ঘটনা ঘটেছে। এটিকে কেন্দ্র করে ব্যাংকগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। অনেকাংশে গ্রাহকের সব ধরনের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে ঋণ দেয়া হচ্ছে। যা পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে পড়ছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) অডিটোরিয়ামে ‘লোন টেকওভার ইন বাংলাদেশ : ইজ ইট এ হেলদি প্রাকটিসেস’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের পরিচালক ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জ্জী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯০ শতাংশ ব্যাংকারের অভিমত হস্তান্তরিত ঋণ ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি বাড়ায়। ৪০ শতাংশ ব্যাংকারের মতে হস্তান্তরিত ঋণ ইতিমধ্যে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর ৫০ শতাংশ ব্যাংকার জানিয়েছেন, হস্তান্তরিত ঋণ নিকট ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বৈঠকে ঋণ হস্তান্তরের উপর গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহেল মোস্তফা। চার সদস্যের গবেষক দলে আরও ছিলেন বিআইবিএমের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মহব্বত হোসেন, বিআইবিএমের লেকচারার তোফায়েল আহমেদ এবং রাহাত বানু।

প্রতিবেদনে ৬০ শতাংশ ব্যাংকার জানিয়েছেন, পরিচালনা পর্যদের অযৌক্তিক চাপে ঋণ হস্তান্তরে ক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। ৫ শতাংশ ব্যাংকারের মতে, ঋণ হস্তান্তরে অদক্ষতা রয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যাংকার জানিয়েছেন, ঋণ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেয়া হয়।

বৈঠকের প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এবং বিআইবিএমের চেয়ার প্রফেসর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তরা ব্যাংকিং খাতে ঢুকে পড়েছে। সম্প্রতি একটি ব্যাংকে গত তিন বছরে তিনজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ৯ মাস ধরে কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, দুই থেকে চার লাখ টাকা দিলে এমডি পাওয়া যাবে কিন্তু ব্যাংক চালানোর মতো যোগ্য লোক পাবেন না। ব্যাংকার ভালো হলে নীতিমালার দরকার নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণ হস্তান্তরের সময় সব বিষয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে হস্তান্তর করা উচিত। সব ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দিলে খেলাপি হওয়ার আশংকা রয়েছে।

সোনালী ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত ইসলাম বলেন, ঋণ হস্তান্তরের অনেক খারাপ দৃষ্টান্ত আছে। কিছু গ্রাহক ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য সরকারি ব্যাংককে টার্গেট করে। তারা বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সে টাকা আর পরিশোধ করেন না।

তিনি আরও বলেন, ঋণ হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে তা ব্যাংক খাতের জন্য ক্ষতিকর। এটি বন্ধ করতে হবে। ঋণ হস্তান্তরে যে গ্রাহকের ঋণ নেয়ার ক্ষমতা ১০ কোটি টাকা তাকে ২০ কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে।

বৈঠকে অন্যান্য বক্তারা বলেন, লোন টেকওভারের (ঋণ হস্তান্তর) ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা করতে হবে। ঋণ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম মানছে না ব্যাংকগুলো। এখানে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে।

উল্লেখ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর-১৬ শেষে ছিল ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। (জুন-সেপ্টেম্বর’১৭) তিন মাসে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি বেড়েছে ৬ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৭৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।

Be the first to comment on "হস্তান্তরিত ঋণের বড় অংশই খেলাপি"

Leave a comment

Your email address will not be published.




one × four =